আগরতলা, ৭ নভেম্বর: দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, সংবিধান এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় আরও শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিআই(এম) নেতা মানিক সরকার। নভেম্বর বিপ্লবের ঐতিহাসিক তাৎপর্য উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
মানিক সরকারের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখতে আরএসএসের প্রভাবাধীন বিজেপি সরকার দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। ধর্ম, জাতপাত ও সম্প্রদায়ের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের ঐক্য ভাঙার কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ দুর্বল করতেই এই বিভাজনের রাজনীতি।
নভেম্বর বিপ্লবের প্রসঙ্গ তুলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাশিয়ার ঐতিহাসিক বিপ্লব বিশ্ববাসীর সামনে কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার বাস্তব প্রয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর এবং শ্রমজীবী মানুষের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানিক সরকার বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি মনে করেছিল বিশ্ব থেকে সমাজতন্ত্রের অবসান ঘটবে। কিন্তু চিন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া ও কিউবার মতো দেশগুলির নিজস্ব পথে উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার প্রচেষ্টা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির সংকটের মধ্যেও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে মানিক সরকারের অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন নীতির কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিক সংকট, বেকারত্ব এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়ছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের প্রবণতা বাড়ায় দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
আসন্ন নির্বাচন এবং ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই বিজেপি ভোটার তালিকাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। শাসক দলের সমর্থক নন বলে মনে করা হচ্ছে, এমন ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মানিক সরকার। কেরলে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তাঁর প্রশাসনিক কর্মজীবন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ দাবির অভিযোগ এবং পদোন্নতি ঘিরে বিতর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদে তাঁর নিয়োগের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বক্তব্যের শেষপর্বে মানিক সরকার বলেন, দেশের সংবিধান, ভোটাধিকার এবং মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সংগঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের লড়াইয়ের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি রক্ষার আন্দোলনকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।