আগরতলা, ১০ অক্টোবর: আগরতলার মহারাজা বীর বিক্রম (এমবিবি) বিমানবন্দর চত্বরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মারধর, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা নতুন বেসরকারি ক্যাব পরিষেবার বিরোধিতার নামে ভাঙচুরের ঘটনা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনে গ্রেপ্তার এবং রোড পারমিট বাতিল করা হবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিলেন রাজ্যের পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী।
শনিবার দুপুরে এমবিবি বিমানবন্দরে প্রিপেইড ট্যাক্সি ও অটোচালকদের মধ্যে ইউনিফর্ম বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই বার্তা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিমানবন্দর হল ত্রিপুরায় আগত বহু পর্যটক ও অতিথির কাছে রাজ্যের প্রথম পরিচিতির জায়গা। সেখানে চালকদের আচরণ যদি অসৌজন্যমূলক হয়, তাহলে রাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তাই যাত্রীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা প্রত্যেক পরিবহণকর্মীর দায়িত্ব।

মন্ত্রী বলেন, “কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতেও রোড পারমিট বাতিল করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে তা বাতিল করা হবে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারও করা হবে।”
সম্প্রতি বিমানবন্দর এলাকায় দুর্ব্যবহার ও যাত্রীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগে দু’টি পৃথক ঘটনায় গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন সুশান্ত চৌধুরী।
অতিথি আপ্যায়নে কোনও ঘাটতি নয়
বিমানবন্দরকে ত্রিপুরার প্রবেশদ্বার হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, পরিকাঠামো ও পরিষেবার জন্য এমবিবি বিমানবন্দর ইতিমধ্যেই প্রশংসা পেয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দরের বাইরে যদি যাত্রীরা দুর্ব্যবহারের শিকার হন, তাহলে সেই ইতিবাচক ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে।
‘অতিথি দেবো ভব’ নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতিথিদের ঈশ্বরের মতো সম্মান দেওয়ার যে সংস্কৃতি ভারতীয় ঐতিহ্যে রয়েছে, তা বাস্তবেও পালন করতে হবে। ত্রিপুরায় বেড়াতে আসা মানুষ যেন ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
ইউনিফর্ম বিতরণে ৪২০ পরিবহণকর্মী
পরিবহণকর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিন বছর আগে ইউনিফর্ম বিতরণের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। মন্ত্রী জানান, এটি শুধুমাত্র দুর্গাপূজার মরশুমে পোশাক দেওয়ার কর্মসূচি নয়, বরং পরিবহণকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধির একটি প্রচেষ্টা। এ বছর পরিবহণ দপ্তরের অর্থায়নে মোট ৪২০ জন কর্মীকে ইউনিফর্ম দেওয়া হচ্ছে।
উবার পরিষেবা নিয়ে চালকদের অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস
বিমানবন্দরে উবারের মতো বেসরকারি ক্যাব পরিষেবা চালু করা নিয়ে স্থানীয় ট্যাক্সি ও অটোচালকদের একাংশের আপত্তির প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, পরিষেবা চালুর আগে গত দু’বছরে স্থানীয় পরিবহণকর্মীদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রিপেইড ট্যাক্সি ও অটোচালকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার আশ্বাস দেন তিনি।
সুশান্ত চৌধুরী জানান, উবারকে রাজ্য সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার কাঠামো মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কিংবা চালকদের কম অর্থ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ থাকলে তার প্রমাণ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, উবারের সাইনবোর্ড ও কাউন্টার ভাঙচুর কিংবা সেগুলি সরিয়ে ফেলার মতো ঘটনার অভিযোগেরও নিন্দা করেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, নতুন পরিষেবা নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে, কিন্তু সেই কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ভাঙচুর করার অধিকার কারও নেই।
চালকদের অভিযোগ শুনল সরকার, তবে আইন মেনেই সমাধানের বার্তা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন পরিবহণকর্মী ভাড়ার ক্ষেত্রে অসংগতি, বহিরাগত গাড়ির চলাচল, পারমিট, লাইসেন্স এবং নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। নির্ধারিত নিয়ম না মেনে কিছু গাড়ি চলাচল করছে বলেও অভিযোগ জানান তাঁরা।
এর জবাবে মন্ত্রী পরিবহণকর্মীদের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে লিখিত অভিযোগ ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ জমা দেওয়ার আহ্বান জানান। বৈধ অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও তিনি স্পষ্ট করেন, কোনও সমস্যার সমাধান সংঘাত বা বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে নয়, আইনসম্মত পথেই করতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, রাজ্য সরকার স্থানীয় পরিবহণকর্মীদের পাশে রয়েছে। তবে তাঁদেরও শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রশাসনকে সহযোগিতা করা এবং যাত্রীদের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করা উচিত। মুখ্যমন্ত্রীও এ ধরনের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
ত্রিপুরার উন্নয়ন এবং রাজ্যের সম্মান রক্ষায় পরিবহণকর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে সুশান্ত চৌধুরী বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা, সুষ্ঠু পরিষেবা এবং অতিথি আপ্যায়ন নিশ্চিত করা সকলের যৌথ দায়িত্ব।
এদিনের অনুষ্ঠানে পরিবহণ দপ্তরের সচিব উত্তম কুমার চাকমা, আইনশৃঙ্খলা বিভাগের আইজি মাঞ্চক ইপ্পার, ট্রাফিকের এসপি কান্তা জাঙ্গির, বিমানবন্দরের অধিকর্তা শেখর দেববর্মা-সহ অন্যান্য আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন।