ট্রিপুরা মেডিক্যাল কলেজে সফল অস্ত্রোপচার, অন্ত্রের প্যাঁচ খুলে স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয় নবজাতককে
আগরতলা, ২৮ সেপ্টেম্বর: জন্মের মাত্র ১৮ দিনের মাথায় জীবন-মরণ সংকটে পড়েছিল এক নবজাতক। বারবার সবুজাভ বমি, অন্ত্রে বাধার আশঙ্কা এবং শেষ পর্যন্ত অন্ত্র পেঁচিয়ে যাওয়ার জটিলতা—পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটজনক হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটিকে সুস্থ করে তুলতে সক্ষম হলেন ট্রিপুরা মেডিক্যাল কলেজ ও ডা. ব্রাম টিচিং হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
শিশুটির নাম আহাদুল ইসলাম। গত ২৭ আগস্ট উত্তর ত্রিপুরার মাকুন্ডা হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবে তাঁর জন্ম। ধনমপুরের বাগ্যাপুরের বাসিন্দা ২৫ বছরের রুবিনা বেগম ও ৩১ বছরের বিলাল মিয়ার দ্বিতীয় সন্তান আহাদুল। বাবা পেশায় রাজমিস্ত্রি এবং মা গৃহবধূ।
জন্মের পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যেই শিশুটির জন্ডিস দেখা দেয়। প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জিবি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির বারবার সবুজাভ বা বিলিয়াস বমি শুরু হয়। নবজাতকের ক্ষেত্রে এ ধরনের বমি সাধারণ খাবার হজমের সমস্যা না হয়ে অন্ত্রে বাধার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা দেখতে শিশুটিকে ১২ সেপ্টেম্বর ট্রিপুরা মেডিক্যাল কলেজ ও ডা. ব্রাম টিচিং হাসপাতালে রেফার করেন।
সেখানে স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটে (SNCU) শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন শিশু ও নবজাতক সার্জন ডা. অনিরুদ্ধ বসাক। শিরায় তরল, অ্যান্টিবায়োটিক, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে গুরুতর সমস্যা—ইনটেস্টাইনাল ম্যালরোটেশন উইথ মিডগাট ভলভুলাস।
চিকিৎসকদের মতে, এই অবস্থায় জন্মগতভাবে অন্ত্রের স্বাভাবিক অবস্থান ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় অন্ত্র পাক খেয়ে যেতে পারে। এর ফলে অন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ইস্কেমিয়া, গ্যাংগ্রিন, মারাত্মক সংক্রমণ এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ১৪ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ জন্মের মাত্র ১৮ দিনের মাথায় শিশুটির জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে ডা. অনিরুদ্ধ বসাক ও তাঁর দল পেঁচিয়ে যাওয়া অন্ত্র ধীরে ধীরে খুলে দেন এবং অস্বাভাবিক অবস্থান সংশোধন করেন।
তবে অস্ত্রোপচারের পরও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। শিশুটির শরীরে সেপসিস দেখা দেয়। ফলে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, বিশেষায়িত নবজাতক পরিচর্যা ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার মধ্যে রাখা হয়।
প্রায় নয় দিন পর পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে চিকিৎসকদের পরামর্শের বিরুদ্ধে পরিবার শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর আবার শিশুটিকে চিকিৎসকদের কাছে ফলো-আপের জন্য নিয়ে আসেন বাবা-মা।
সেদিন চিকিৎসকদের সামনে বাবা-মায়ের কোলে শিশুটিকে কাঁদতে দেখা যায়। জন্মের প্রায় এক মাসের মাথায় তাকে তুলনামূলকভাবে সুস্থ অবস্থায় দেখে স্বস্তি ফিরে আসে চিকিৎসক ও পরিবারের মধ্যে।
এই ঘটনা নবজাতকের সবুজ বা বিলিয়াস বমি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও সামনে এনেছে। চিকিৎসকদের মতে, নবজাতকের সবুজাভ বমিকে শুধুমাত্র দুধ খাওয়ানোর সমস্যা বা সাধারণ বদহজম হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর পেছনে অন্ত্রে বাধা কিংবা ম্যালরোটেশনের মতো গুরুতর অস্ত্রোপচারজনিত সমস্যা থাকতে পারে।
আহাদুলের ক্ষেত্রে দ্রুত রেফারাল, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং বিশেষায়িত নবজাতক পরিচর্যাই শেষ পর্যন্ত তাকে সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।