নজরুল কলাক্ষেত্রে অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ সভা, পেশ ২৭ দফা দাবি সনদ
আগরতলা, ১১ অক্টোবর: শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষকসমাজের অধিকার সুরক্ষা এবং বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ, ত্রিপুরা (মহাবিদ্যালয় শিক্ষা)-এর বার্ষিক সাধারণ সভা। রবিবার নজরুল কলাক্ষেত্র অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই সভায় সংগঠনের বার্ষিক কার্যক্রম ও আর্থিক হিসাব পর্যালোচনার পাশাপাশি শিক্ষকসমাজের বিভিন্ন সমস্যা, দাবি ও প্রত্যাশাকে সামনে রেখে ২৭ দফা দাবি সনদও পেশ করা হয়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সরস্বতী বন্দনা ও মা সরস্বতীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে। বিদ্যা, কর্তব্য ও সেবার আদর্শকে সামনে রেখে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের জাতীয় সভাপতি অধ্যাপক নারায়ণ লাল গুপ্ত, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ত্রিপুরা প্রান্তের প্রান্ত প্রচারক নিখিল শঙ্কর নিওয়াসকর, সংগঠনের ত্রিপুরা প্রান্তের সভাপতি তীর্থরাম রিয়াং, সংগঠনমন্ত্রী ধীরেন্দ্র দেবনাথ-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা।
সভায় সংগঠনের ত্রিপুরা প্রান্তের সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস রায় চৌধুরী ২০২৫-২৬ বর্ষের বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। বিগত এক বছরের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও অগ্রগতির বিবরণ তুলে ধরার পাশাপাশি সংগঠনের কাজে সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, কোষাধ্যক্ষ তপনজ্যোতি মালাকার সংশ্লিষ্ট অর্থবর্ষের আয়-ব্যয়ের হিসাব পেশ করেন। সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদা এবং বিভিন্ন খাতে অর্থব্যয়ের বিবরণও সভায় তুলে ধরা হয়।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংগঠনের জাতীয় সভাপতি অধ্যাপক নারায়ণ লাল গুপ্ত শিক্ষকসমাজকে রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে প্রাচীন ভারতীয় গুরুপরম্পরা, শিক্ষার ঐতিহ্য এবং জাতীয় জীবনে শিক্ষকদের দায়িত্বের প্রসঙ্গ। সংগঠনের মূলমন্ত্র—‘রাষ্ট্রের হিতে শিক্ষা, শিক্ষার হিতে শিক্ষক এবং শিক্ষকের হিতে সমাজ’—ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষকদের কল্যাণ এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাঁর দাবি, দেশজুড়ে বিভিন্ন স্তরে ১৫ লক্ষেরও বেশি শিক্ষক এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ত্রিপুরা প্রান্তের প্রান্ত প্রচারক নিখিল শঙ্কর নিওয়াসকর আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে ভারতের নিজস্ব শক্তি, সামর্থ্য ও ঐতিহ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান। ভারতীয় সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা, প্রতিভা ও প্রাচীন প্রজ্ঞার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করার জন্য শিক্ষকসমাজকে অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর মতে, ভারতের ঐতিহ্য ও জ্ঞানসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সংগঠনের ত্রিপুরা প্রান্তের সভাপতি তীর্থরাম রিয়াং তাঁর বক্তব্যে রাজ্যের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্বার্থরক্ষা এবং সংগঠনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও চাকরিসংক্রান্ত বিষয়গুলির পাশাপাশি মহার্ঘ ভাতা (ডিএ), বাড়িভাড়া ভাতা (এইচআরএ) এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি ত্রিপুরা সরকারকে ধন্যবাদ জানান। শিক্ষকসমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মান উন্নয়নে সংগঠন কাজ করে চলেছে বলেও তিনি জানান।
বার্ষিক সাধারণ সভার দ্বিতীয় অধিবেশনে শিক্ষকসমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই পর্বে সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস রায় চৌধুরী সংগঠনের পক্ষ থেকে ২৭ দফা দাবি সনদ উপস্থাপন করেন। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিভিন্ন দাবি, পেশাগত সমস্যা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে তৈরি এই দাবি সনদ সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সভাপতি অধ্যাপক নারায়ণ লাল গুপ্ত, ত্রিপুরা প্রান্তের সংগঠনমন্ত্রী ধীরেন্দ্র দেবনাথ এবং সভাপতি তীর্থরাম রিয়াং-সহ অন্যান্যরা।
দ্বিতীয় অধিবেশনে অধ্যাপক নারায়ণ লাল গুপ্তের বৌদ্ধিক বক্তব্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় বিকশিত ভারত গঠনের স্বপ্ন এবং ভারতকে বিশ্বগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্ব। ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানব্যবস্থার প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি কর্তব্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় চেতনার বিকাশের ওপর জোর দেন। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আরও আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ভারতীয় সংস্কৃতির ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ ধারণাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। জাতীয় সংগীত ও জাতীয় গানের তাৎপর্য প্রসঙ্গে ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রাসঙ্গিকতা উল্লেখ করে বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার বার্তাও দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে রামঠাকুর মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মৌশম ভট্টাচার্য উপস্থিত অতিথি, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সংগঠনের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এরপর সমবেতভাবে জাতীয় গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বার্ষিক সাধারণ সভার সমাপ্তি ঘটে।