পুনর্বাসন, নিরাপত্তা, মামলা প্রত্যাহার ও সরকারি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির দাবিও আন্দোলনকারীদের
আগরতলা, ৪ সেপ্টেম্বর: ২৫০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্যাকেজ বাস্তবায়নের দাবি ত্রিপুরায় আত্মসমর্পণকারী প্রাক্তন জঙ্গি সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের ডাকা ৭২ ঘণ্টার সড়ক ও রেল অবরোধের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শান্তিচুক্তির অধিকাংশ বিষয়ই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তাই রাতারাতি সব দাবি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আত্মসমর্পণকারীদের দাবি সময়বদ্ধভাবে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
All Returnees Rehabilitation Committee (JTRC)-এর অধীনে সাতটি ইউনিটের প্রতিনিধিরা এই অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। এর ফলে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে পুনর্বাসন, নিরাপত্তা, প্রাক্তন ক্যাডারদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা, সরকারি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি, রেশন কার্ডে নাম সংযোজন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং চুক্তি অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার সময় পশ্চিম ত্রিপুরার জেলা শাসক ড. বিশাল কুমার জানান, প্রশাসনের কাছে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট চুক্তি এবং দাবি সনদের সম্পূর্ণ নথি জমা পড়েছে। নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই নথি উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হবে।
৭২ ঘণ্টার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই অবরোধ প্রত্যাহার করা সম্ভব কি না, জানতে চাওয়া হলে জেলা শাসক জানান, বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যত দ্রুত সম্ভব অবরোধ তুলে নিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
চুক্তিতে কোনও ভুল রয়েছে বলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগের বিষয়েও সরাসরি মন্তব্য করেননি জেলা শাসক। বিষয়টি ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তর বা রাজ্য সরকারই এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারবে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে এক সিনিয়র সরকারি প্রতিনিধি আত্মসমর্পণকারী প্রাক্তন ক্যাডারদের উদ্দেশে বলেন, তাঁদের কল্যাণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চুক্তিতে যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলি নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, বেশ কিছু দাবি পূরণ করতে সরকারি অনুমোদন ও বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে মামলা প্রত্যাহার, সরকারি তালিকায় নাম পরিবর্তন বা সংযোজন, রেশন কার্ডে নতুন সুবিধাভোগীর নাম অন্তর্ভুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং আত্মসমর্পণকারীদের প্রস্তাব অনুযায়ী ২৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্যাকেজের পরিকল্পনা তৈরি।
সরকারি প্রতিনিধির বক্তব্য, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। যে বিষয়গুলি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব, সেগুলি দ্রুত করার চেষ্টা করা হবে। তবে যেসব বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন ও সমন্বয় প্রয়োজন, সেগুলিতে স্বাভাবিকভাবেই আরও সময় লাগবে।
২৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্যাকেজ প্রসঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি জানান, আত্মসমর্পণকারীদের তৈরি অ্যাকশন প্ল্যান ও প্রকল্প প্রস্তাব সরকার খতিয়ে দেখতে প্রস্তুত। প্রস্তাবগুলি সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী হলে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, এর আগে পুনর্বাসন সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে প্রাক্তন ক্যাডার ও তাঁদের পরিবারের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে তিনি অবগত। তাঁদের বেশ কিছু দাবি যথার্থ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পুলিশি বিষয়, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুত অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নে সরকার কাজ করবে বলে আশ্বাস দেন।
একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে আটকে থাকা মামলা বা অন্যান্য সমস্যার বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করে সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা লিখিত ও নির্দিষ্ট সময়সীমার দাবি থেকে সরে আসেননি। সরকারি তালিকায় প্রাক্তন ক্যাডারের সংখ্যা নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে তাঁরা স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি ক্যাডার ও সংগঠনের নেতাদের নিরাপত্তা, উন্নয়ন সহায়তা, জীবিকার প্রকল্প এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরেন তাঁরা।
সরকারি আধিকারিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উচ্চপর্যায়ে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বাস্তবায়নে প্রশাসন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে দাবি আদায়ের জন্য সড়ক ও রেল অবরোধ না করার জন্য আন্দোলনকারীদের আবেদন জানানো হয়। বিভিন্ন দাবির কারণে সাধারণ যাত্রী ও মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি না করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, তাঁদের সমস্ত দাবি সংশ্লিষ্ট নোডাল দপ্তর ও উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হবে। সরকারের বক্তব্য, সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমেই এই অচলাবস্থার সমাধান করতে চায় প্রশাসন।
এখন মূল লক্ষ্য, দ্রুত আন্দোলনকারীদের অবরোধ প্রত্যাহারে রাজি করানো এবং রাজ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করা। পাশাপাশি পুনর্বাসন, জীবিকা সহায়তা ও ২৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্যাকেজ-সহ বাকি দাবিগুলি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও উচ্চপর্যায়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।