Table of Contents
৬০ শতাংশ গাছ এখনও টিকে রয়েছে, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বর্জ্য প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ
আগরতলা, ৪ সেপ্টেম্বর: কৈলাসহরে সবুজায়নের লক্ষ্যে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া উদ্যোগ এখন ধীরে ধীরে গোটা ত্রিপুরায় পরিবেশ সচেতনতার আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। ‘ব্যাক টু নেচার’ কর্মসূচির মাধ্যমে গত তিন বছর ধরে বৃক্ষরোপণ, চারাগাছের পরিচর্যা এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে চলেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘গো গ্রিন ভলান্টিয়ার্স’।
২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মহিলারাও রয়েছেন। সংগঠনের দাবি, এখনও পর্যন্ত ঊনকোটি জেলা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ২০ হাজারেরও বেশি চারা গাছ রোপণ করা হয়েছে।
কৈলাসহর পুর পরিষদ, কৈলাসহর মহকুমা প্রশাসন এবং কৈলাসহর প্রেস ক্লাবের সহযোগিতায় এই উদ্যোগের সূচনা হয়। পরবর্তীতে রাস্তার ধারে এবং বিভিন্ন শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মৃণাল কান্তি সিনহা জানান, গাছ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণত স্থানীয় প্রজাতির ফলদ ও ঔষধি গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, বর্তমানে রোপণ করা গাছগুলির প্রায় ৬০ শতাংশ টিকে রয়েছে। বেশ কিছু গাছ ইতিমধ্যেই প্রায় পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে।
তবে প্রথম বছরে চারাগাছের টিকে থাকার হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। পরবর্তীতে বেশ কিছু গাছ নষ্ট হয়ে যায় বলে দাবি সংগঠনের। মৃণাল কান্তি সিনহার অভিযোগ, কিছু গাছ ভাঙচুরের কারণে এবং কিছু পরিকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজের জেরে নষ্ট হয়েছে।
গো গ্রিন ভলান্টিয়ার্সের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে পেচারথল JNB, বিলাশপুর শৃঙ্গেরী মঠ, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন রোড, কৈলাসহর বিমানবন্দর সড়ক এবং বিদ্যানগর স্কুলের সংযোগকারী রাস্তা-সহ বিভিন্ন এলাকা।
প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে চারাগাছের সুরক্ষা
বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও যুক্ত করেছে সংগঠনটি। ঊনকোটি বন বিভাগের সহযোগিতায় ‘গ্রিন গার্ডস’ প্রকল্পের মাধ্যমে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করে চারাগাছের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সংগঠনের দাবি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজার পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে।
ঊনকোটির পাহাড়ে ২ হাজার ফলদ চারা
কৈলাসহর বন বিভাগের সহযোগিতায় বর্তমানে ‘গ্রিন ঊনকোটি, সেভ ঊনকোটি’ প্রকল্পও চলছে। এই প্রকল্পের আওতায় ঊনকোটির পাহাড়ের উপর প্রায় ২ হাজার ফলদ চারা রোপণ করা হয়েছে।
সংগঠনের সদস্য মৃণাল কান্তি সিনহার বক্তব্য অনুযায়ী, ঊনকোটি এলাকায় এই বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের জন্য বিধায়ক BEUP তহবিল থেকে ৩.৮০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ ও সমাজশিক্ষা মন্ত্রী টিঙ্কু রায় এবং বিধায়ক বিরজিত সিনহার উদ্যোগে এই অর্থ বরাদ্দ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ঊনকোটি এলাকার জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা এবং সীতাকুণ্ড পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি এলাকার বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ে মিয়াওয়াকি বন
কৈলাসহরের PM Shri Kendriya Vidyalaya-তেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় একটি মিয়াওয়াকি বন তৈরি করেছে গো গ্রিন ভলান্টিয়ার্স। কম জায়গায় ঘন সবুজায়নের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে আরও সবুজ করে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
শুধু গাছ লাগানো নয়, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং চারাগাছকে সুরক্ষিত রাখতে লাগানো লোহার গার্ড খুলে ফেলা বা নষ্ট করার বিরুদ্ধেও সচেতনতা কর্মসূচি চালাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করা এখনও অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তবে কৈলাসহর পুর পরিষদ ও জেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে গাছ লাগানোর পর সেগুলিকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংগঠনের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, বড় হয়ে ওঠা বেশ কিছু গাছও ভাঙচুরের কারণে নষ্ট হয়েছে।
গো গ্রিন ভলান্টিয়ার্সের মতে, শুধু একদিনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়, গাছের পরিচর্যা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ সম্পর্কে ধারাবাহিক সচেতনতাই স্থায়ী সবুজায়নের মূল চাবিকাঠি। তাই তাঁদের ‘ব্যাক টু নেচার’ কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল চারা রোপণ নয়—সেই চারাকে বড় করে তোলা এবং পরিবেশ রক্ষাকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দায়িত্বে পরিণত করা।