Table of Contents
ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে পারে সংস্কারকাজ, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ রাজ্য সরকারের
আগরতলা, ৯ অক্টোবর: দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা রাজ্যের প্রথম জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গুমতি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে ত্রিপুরা সরকার। প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের সংস্কার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ থেকে ১১ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সংস্কারকাজ শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী রতনলাল নাথ।
শুক্রবার গোমতী জেলার তীর্থমুখে গুমতি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত একদিনের জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী এই ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্রকল্পটির যন্ত্রপাতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এবার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সমীক্ষা ও পর্যালোচনার পর প্রকল্পটিকে নতুন করে চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রাজ্য সরকার।
মন্ত্রী জানান, গুমতি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রথমদিকে তিনটি উৎপাদন ইউনিট ছিল, যার সম্মিলিত স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১৫ মেগাওয়াট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে প্রায় ২.৫ মেগাওয়াটে নেমে এসেছিল। এরপর ২০২৪ সালের বন্যায় প্রকল্পের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রকল্পটি পুনরায় চালু করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে একাধিক প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আগরতলার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এনআইটি), গুয়াহাটির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি), নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন (এনইইপিসিও) এবং ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (বিএইচইএল)।
প্রকল্পের জলের নীচে থাকা অংশগুলি পরীক্ষা করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত বিশেষ আন্ডারওয়াটার রোভারও ব্যবহার করা হয়েছে। এর সাহায্যে জলের নীচের অংশের ছবি সংগ্রহ করে ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়েছে। এই সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রায় ১০০ কোটি টাকার সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে বলে জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী।
বাঁধের নিরাপত্তায় নিয়মিত পরিদর্শনের উপর গুরুত্ব
বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরায় চালুর পাশাপাশি বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন রতনলাল নাথ। তাঁর বক্তব্য, বাঁধের আশপাশে এবং ভাটির দিকে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন, আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।
এক্ষেত্রে বাঁধ নিরাপত্তা আইন, ২০২১-এর গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। বর্ষার আগে ও পরে বাঁধের অবস্থা পরীক্ষা করা, আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু রাখা এবং প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ, সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার উপর জোর দেন মন্ত্রী।
পর্যটন ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ডম্বুর হ্রদ
ডম্বুর হ্রদকে ত্রিপুরার অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। তাঁর মতে, এই জলাধার পর্যটন, অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪৮টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ডম্বুর জলাধার শীতকালে পরিযায়ী পাখিদেরও অন্যতম আশ্রয়স্থল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের কারণে এই এলাকায় ইকো-ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পর্কে পড়ুয়াদের সচেতনতা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পড়ুয়া ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন উৎস সম্পর্কেও অবহিত করেন মন্ত্রী। জলবিদ্যুৎ, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি, বায়োমাস এবং পারমাণবিক শক্তির মাধ্যমে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, তা ব্যাখ্যা করেন তিনি।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—উৎপাদন, সঞ্চালন ও বণ্টন সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এই সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন আমরপুরের ১২৪ নম্বর ব্যাটালিয়ন সিআরপিএফের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অখিলেশ কুমার সিং, গোকুলনগরের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফের ইন্সপেক্টর সুশীল কুমার, জাতীয় বাঁধ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের (এনডিএসএ) প্রতিনিধিরা, টিপিজিএলের আধিকারিক, প্রকৌশলী, রাজ্য বাঁধ নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য, জনপ্রতিনিধি এবং জেলা প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের আধিকারিকরা।
সব মিলিয়ে, প্রায় ১০০ কোটি টাকার এই সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গুমতি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ফের বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের পুনরুজ্জীবন নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে সংস্কারকাজ শুরু ও সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার উপর।