ইথিওপিয়ায় গ্লোবাল রাইস পলিসি ডায়ালগে তুলে ধরলেন পরিকল্পিত সেচ পরিকাঠামো গড়ার প্রস্তাব, কেনিয়া সরকারের সঙ্গেও চলছে গবেষণামূলক উদ্যোগ
আগরতলা, ২৬ অক্টোবর: আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে ফের ত্রিপুরার নাম উজ্জ্বল করলেন কৈলাশহরের বিজ্ঞানী ডাঃ দেব। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ধান উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আমদানি করা চালের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে পরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর এই প্রস্তাব কৃষিক্ষেত্রে জলসম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল রাইস পলিসি ডায়ালগে নিজের মতামত তুলে ধরেন ডাঃ দেব। সেখানে তিনি বলেন, আফ্রিকার যেসব অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলি চিহ্নিত করে উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং দক্ষ জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
ডাঃ দেবের মতে, উন্নত সেচ ব্যবস্থা ধান চাষের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এর ফলে আফ্রিকার দেশগুলিতে চালের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়বে এবং বিদেশ থেকে চাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথ প্রশস্ত হবে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমানে কেনিয়া সরকারের সঙ্গে কাজ করছেন ডাঃ দেব। সেচ পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত অঞ্চল চিহ্নিত করা এবং কোথায় এই ধরনের উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি সুফল দিতে পারে, তা খতিয়ে দেখাই এই সহযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে উপলব্ধ জলসম্পদের টেকসই ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল রাইস পলিসি ডায়ালগের আয়োজনে সহায়তা করেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইআরআরআই), আফ্রিকারাইস এবং ইথিওপিয়ান ইনস্টিটিউট অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা। এই সম্মেলনে ধান উৎপাদন, কৃষির উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করার নীতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের গবেষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেন।
বর্তমানে ডাঃ দেব বারাণসীতে অবস্থিত আইআরআরআই-এর দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কেন্দ্রে জল ও জলবায়ু গবেষণা ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেচ ব্যবস্থা, কৃষিক্ষেত্রে জল ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুর সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও তাঁর গবেষণামূলক কাজ বিস্তৃত। কেরলে বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পে তিনি যুক্ত রয়েছেন। এই প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত খালভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় জলের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য নথিভুক্ত করার কাজ চলছে। এর উদ্দেশ্য হলো সেচ ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত করা এবং কৃষিকাজে জলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।
এছাড়াও, নাসা ও ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর যৌথ পৃথিবী পর্যবেক্ষণ অভিযান ‘নিসার’ (NISAR) উপগ্রহের তথ্য যাচাইয়ের কাজে নাসার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন ডাঃ দেব। উপগ্রহ থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণমূলক তথ্যের সঙ্গে কৃষি ও জলসম্পদ সংক্রান্ত গবেষণার সমন্বয় ঘটিয়ে ভবিষ্যতে জল ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি পরিকল্পনাকে আরও কার্যকর করার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
গ্রামীণ কৈলাশহরে বেড়ে ওঠা ডাঃ দেব অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসল থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব আলাবামায় পোস্টডক্টরাল গবেষণাও করেন।
সেচ, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষির উন্নয়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর গবেষণামূলক অবদান নিজের জন্মভূমি কৈলাশহরের জন্যও গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার দেশগুলিতে ধান উৎপাদন বাড়ানোর জন্য টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকারও পরিচয় বহন করছে।