আগরতলা, ২১ আগস্ট: কিউবার বিপ্লব টিকে থাকার পেছনে সে দেশের মানুষের ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মন্তব্য করলেন ভারতে নিযুক্ত কিউবার রাষ্ট্রদূত হুয়ান কার্লোস মার্সান আগুইলেরা। শুক্রবার আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত সংহতি সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী আদর্শ এখনও কিউবার জনগণকে পথ দেখাচ্ছে।
সভায় কিউবার বর্তমান পরিস্থিতি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক দর্শন এবং ভারত-কিউবা সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রদূত। তাঁর দাবি, কিউবা সমাজতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাওয়ার পর থেকেই একের পর এক মার্কিন প্রশাসন দেশটির বিপ্লবী ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু কিউবার মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও ঐক্যের কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে তাঁদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে। কিউবায় গণতন্ত্রের নিজস্ব একটি ধারণা গড়ে উঠেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠীর প্রভাবের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কিউবার বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত কঠিন বলে উল্লেখ করে মার্কিন প্রশাসনের নীতির তীব্র সমালোচনা করেন আগুইলেরা। তাঁর অভিযোগ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন ধরনের চাপের লক্ষ্য হল বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। কিউবার ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ এবং দেশটিকে ‘সন্ত্রাসবাদে মদতদাতা রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্তকেও তিনি অন্যায্য বলে দাবি করেন।
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবার ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য, পর্যটন, খনি ও পরিবহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট কিউবার পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সংগ্রহে সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল, ওষুধ উৎপাদন, কৃষি, জল সরবরাহ, পরিবহণ, যোগাযোগ ও শিক্ষা ব্যবস্থায়।
তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও কিউবা অর্থনীতির পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে বলে জানান আগুইলেরা। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি ও পর্যটন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে আসে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৩০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করে বলেন, মার্কিন নীতির পরিবর্তনের অপেক্ষায় বসে নেই কিউবা। নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে দেশের মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন। কিউবা শান্তি চায়, তবে একইসঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষায় তারা প্রস্তুত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কিউবার পাশে বহু দেশ রয়েছে বলে দাবি করেন আগুইলেরা। রাষ্ট্রসংঘে অধিকাংশ দেশই ধারাবাহিকভাবে কিউবার ওপর মার্কিন অবরোধের বিরোধিতা করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একতরফা নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে বহুপাক্ষিকতা, শান্তি, সহযোগিতা, সংহতি এবং প্রতিটি দেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্মান করার জন্য গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির মধ্যে আরও ঐক্যের আহ্বান জানান তিনি।
ভারত-কিউবা সম্পর্কেও গুরুত্ব
ভারতের সঙ্গে কিউবার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথাও তুলে ধরেন কিউবার রাষ্ট্রদূত। ভারতীয় জনগণের দীর্ঘদিনের সংহতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো ভারত-কিউবা সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ১৯৫৯ সালে চে গুয়েভারার ভারত সফর এবং ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর ভারত সফরের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
ঔপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতা এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি দুই দেশের অঙ্গীকার ভারত-কিউবা সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মন্তব্য করেন আগুইলেরা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির পতনের পর কিউবার কঠিন সময়েও ভারত পাশে দাঁড়িয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। সেই সময় ভারত থেকে কিউবায় গম ও চাল পাঠানোর বিষয়টিও স্মরণ করেন রাষ্ট্রদূত। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে কিউবায় ওষুধ পাঠানোর উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সমাপ্তি বক্তব্যে আগুইলেরা বলেন, ১৯৫৩ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে যে বিপ্লবী পথচলা শুরু হয়েছিল, বর্তমান প্রজন্মের কিউবানরা সেই উত্তরাধিকারকে হারিয়ে যেতে দেবে না। ঐক্যবদ্ধ কিউবার জনগণ সমাজতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদর্শকে রক্ষা করে এগিয়ে যাবে বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।