কমলপুর থেকে মোহনপুর, জিরানিয়া ও রাণীরবাজার—বিরোধী প্রার্থীদের উপর হামলা ও ভয় দেখানোর অভিযোগ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর। হাইকোর্টের নির্দেশের পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর বাম নেতৃত্বের।
আগরতলা, ৬ নভেম্বর: আসন্ন পুর নির্বাচনকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর্বে বিরোধী প্রার্থীদের উপর একের পর এক হামলা, হুমকি এবং বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সরব হলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিআইএমের প্রবীণ নেতা মানিক সরকার। তাঁর অভিযোগ, শাসক দলের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা পরিকল্পিতভাবে বিরোধী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
শুক্রবার সাংবাদিকদের সামনে বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে মানিক সরকার জানান, নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই বিরোধী দল, বিশেষ করে সিপিআইএমের নেতা-কর্মীদের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। কমলপুর, জিরানিয়া, মোহনপুর, রাণীরবাজার এবং শান্তিরবাজারে একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
কমলপুরের ঘটনা উল্লেখ করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মনোনয়ন জমা দিতে যাওয়ার প্রথম দিনেই তাঁদের প্রার্থীদের উপর হামলা চালানো হয়। এতে চারজনের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। স্থানীয় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের জেলা হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মোহনপুরের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে দাবি করেন মানিক সরকার। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী প্রার্থীদের এসডিএম কার্যালয়ে প্রবেশ আটকাতে অফিসের সামনে গাড়ি এবং এমনকি একটি বুলডোজার পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে মনোনয়ন জমা দেওয়ার চেষ্টা করলে ফের হামলার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ১৫ জন আহত হয়েছেন বলেও দাবি তাঁর।
জিরানিয়া, রাণীরবাজার ও শান্তিরবাজারেও সিপিআইএম নেতা-কর্মীদের ভয় দেখানো এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। জিরানিয়ায় দলের এক নেতার পরিবারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ৬ নভেম্বরের আগে ওই নেতা যেন এলাকায় প্রবেশ না করেন।
মানিক সরকারের বক্তব্য, এই সমস্ত ঘটনা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিক এবং জেলাশাসকদের নজরে আনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, যেখানে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ারই সুযোগ পাচ্ছেন না, সেখানে কীভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব?
এই পরিস্থিতিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল সিপিআইএম। শুক্রবার হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট পাঁচটি এলাকায় বিরোধী প্রার্থীদের নিরাপদে মনোনয়ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানান তিনি। আদালতের নির্দেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং পুলিশ সুপারদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশককেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তবে আদালতের নির্দেশের পর বাস্তবে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তা দেখার পরেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের সামনে বিরোধীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, মোহনপুর, জিরানিয়া, রাণীরবাজার ও আগরতলা থেকে সিপিআইএম এবং বামফ্রন্টের নেতা-কর্মীরা নিজেদের অভিযোগ জানাতে কমিশনের দপ্তরে উপস্থিত হয়েছিলেন। কমিশনের প্রতিনিধিরা তাঁদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত কোনও প্রতিনিধি দলকে আলোচনার জন্য ডাকা হয়নি বলে অভিযোগ করেন মানিক সরকার।
প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালীন নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর কাছে আসা খবর অনুযায়ী, এক ব্যক্তি মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তখনও তাঁদের হাতে আসেনি বলে জানান তিনি।
পুর নির্বাচনের আগে মনোনয়ন জমাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের তরফে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশ্বাস, অন্যদিকে বিরোধীদের নিরাপত্তা ও বাধাদানের অভিযোগ—এই দুইয়ের মধ্যে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ কতটা স্বাভাবিক থাকে, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।